জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে অপপ্রচারের বিষয়ে সতর্ক থাকতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত সংসদীয় বিশেষ কমিটি। কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সংস্কারের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব সুপারিশ করবে বিশেষ কমিটি।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে ছাত্রদল। অন্যদিকে সংবিধান সংস্কার সভা ও সাংবিধানিক কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে ছাত্র ফেডারেশন। আর গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগ তুলে বৈঠক বর্জন করেছে ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি ও ডাকসুর প্রতিনিধিরা।
বৈঠকে কমিটির সদস্য ও চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নূরুল হক, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন অংশ নেন।
সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে ছিল সংবিধানে শিক্ষা ও চিকিৎসাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা, জুলাই যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা, গণ-অভ্যুত্থানের দাবি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, জুলাই জাতীয় সনদের টেকসই বাস্তবায়ন, প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যমান ক্ষমতা, নারী ও শিশুর সুরক্ষা, জরুরি অবস্থাসংক্রান্ত বিধান, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা এবং গণভোট।
বৈঠকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্রদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। আলোচনায় বলা হয়, ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে তরুণরাই জাতিকে পথ দেখিয়েছে। তরুণদের কল্যাণ এবং জনবান্ধব রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে একটি যুগোপযোগী সংবিধান প্রণয়নের বিষয়েও আলোচনা হয়। এ সময় উপস্থিত ছাত্র প্রতিনিধিরা নিজ নিজ সংগঠনের প্রস্তাব তুলে ধরেন। বিস্তারিত প্রস্তাব লিখিত আকারে জমা দিতে তাঁদের সাত দিন সময় দিয়েছে কমিটি।
বৈঠক শেষে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব সাংবাদিকদের বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন তাঁরা। পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সংবিধানের মূলনীতিতে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমতগুলো বিবেচনায় নেওয়ার কথাও বলেছেন তাঁরা।
ছাত্রদলের পক্ষ থেকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের পরিবর্তে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় সংশোধনী বিল এনে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা হলে ভবিষ্যতে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতি সৈকত আরিফ বলেন, সংবিধান সংস্কারের জন্য একটি সংস্কার সভা গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন তাঁরা। নির্বাচন কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের জন্য একটি সাংবিধানিক কমিশন গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে তাঁদের। এ ছাড়া বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পৃথক সচিবালয় গঠন এবং দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত তিন ধারার শিক্ষাব্যবস্থাকে এক ধারায় নিয়ে আসার প্রস্তাব দিয়েছেন তাঁরা।
বৈঠকে ছাত্রদল, বামপন্থী কয়েকটি ছাত্র সংগঠন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক সিনথিয়া জাহীন আয়েশা এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) ভিপি আব্দুর রশিদ জিতুসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন জানান, ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তি ছাড়া প্রায় ১৫টি ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধি বৈঠকে অংশ নেন।